বুধবার, ৮ জুলাই, ২০২০

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ২

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ভোম্বল সর্দার

বইয়ের নাম- ভোম্বল সর্দার
লেখক- খগেন্দ্রনাথ মিত্র
প্রকাশক- নবপত্র প্রকাশন
পৃষ্ঠা- ৩২৮





সারসংক্ষেপ- এই উপন্যাসের কেন্দ্রবিন্দু এক পিতৃমাতৃহীন কিশোর, ভূপেন্দ্রনাথ চাকি ওরফে ভোম্বল, পাড়ার ছেলেরা যাকে সর্দার বলে মানে। ভোম্বল দুর্গাপুরে তার কাকা-কাকিমার কাছে থাকে। একদিন ভোম্বল-সহ পাড়ার অন্য ছেলেরা খেলা করতে গিয়ে কাঠগোলার মজুরদের একটি ডিঙি ডুবিয়ে ফেলে। মজুরেরা পাড়ার কর্তাদের কাছে নালিশ করতে আসায়, পাড়ার মোড়ল নিধু চক্রবর্তীর কাছারিঘরের বারান্দায় বিচার-সভা বসে, কিন্তু দেখা যায় যে বাকি ছেলেরা সেখানে উপস্থিত থাকলেও তাদের সর্দার সেখানে নেই, সে পালিয়েছে এবং ঠিক করেছে যে আর বাড়ি ফিরবে না। তার ইচ্ছা রাত দুটোর ট্রেনে করে কলকাতায় যাবে দিয়ে সেখান থেকে যাবে টাটানগর যেখানে বিশাল কারখানা আছে। সেই কারখানায় কোন এক কাজে লেগে পড়ার অভিপ্রায় নিয়ে সে তার গন্তব্যের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেয়। সেই পথে অনেক ঘটনা ঘটে, বহু মানুষের সাথে তার দেখা হয়, আলাপ হয় এবং একদিন সে তার গন্তব্য স্থানে পৌঁছোয়।


পাঠ প্রতিক্রিয়া- এই উপন্যাসের পটভূমি গ্রামবাংলা। লেখক বাংলার গাছপালা, পশু-পাখী, নদী-নালা, খাল-বিলের অপূর্ব বিবরণ দিয়েছেন। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার কথা এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে সব কিছুকে যেন জীবন্ত বলে মনে হয়, তা সে কোন পল্লীবধূর চুল ঝাড়ার বর্ণনা হোক, কি পাঠশালার কোলাহলের বিবরণ হোক, কি গ্রামের মানুষের অন্নপ্রাশন বাড়িতে ভোজ খাওয়ার বর্ণনা হোক। সাধারণ খাবারের কথা পড়েও খিদে পেয়ে যায়। গ্রামের মানুষ পর কে যে কত সহজে আপন করে নিতে পারে তা এই উপন্যাস না পড়লে আমি জানতে পারতাম না। ভোম্বলের কথা পড়তে গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে লেখক একটি কিশোরের মনকে নিপুণ ভাবে বোঝার ফলেই এই উপন্যাসটি লিখতে পেরেছেন। এক পিতৃমাতৃহীন ছেলের মন যে কেমন হাহাকার করে তা আমরা বইটি পড়ে ভালভাবেই বুঝতে পারি। তাই ভোম্বলের মনে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে যে তার কাকা-কাকিমা কি তাকে আদৌ ভালবাসেন? সে ভাবে যে তার মা-বাবা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে কি তার সাথে একই রকম ব্যবহার করতেন? তার ধারণা হয় যে কেউই তাকে ঠিক মতো বুঝতে পারে না।
                                       এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ভোম্বল। সে যেহেতু একজন কিশোর তাই তার মন স্বাভাবিক ভাবেই আবেগপ্রবণ। তাই সে কথায় কথায় তার কাকা-কাকিমার ওপর অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সে বাস্তবজ্ঞানহীন বলেই বাড়ি ছাড়ার আগে এটা ভেবে দেখে না যে সে পথে কোথায় আশ্রয় পাবে বা কি খাবে, হাতে কিছু টাকা রাখার কথাও তাই তার মনে আসে না। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এক গ্রামের একজন বৃদ্ধা ভোম্বলকে আশ্রয় দেয় এবং বলে যে ভোম্বল যদি তার কাছে থেকে যায় তাহলে তার সমস্ত সম্পত্তি সে তাকে দিয়ে দেবে, তা সত্ত্বেও ভোম্বল সেখান থেকে পালিয়ে যায় এই ভেবে যে গ্রামের থেকে টাটানগর অনেক শ্রেয়, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি তার বুদ্ধি কতটা অপরিণত। ভোম্বলের আত্মমর্যাদাবোধ যে কতটা তা বোঝা যায় যখন তার বন্ধু সুধীরের মামারবাড়িতে অব্রাহ্মণ বলে অপমানিত হওয়ার পরে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, "বামুনবাড়িতে আর কখনও জল খাব না।" ভোম্বল কল্পনাপ্রবণ বলেই নিজের মতো করে টাটানগরের কারখানার চিত্র নিজের মনের মধ্যে এঁকে নেয়, সে ভাবে মোটরগাড়ি, এরোপ্লেন, ডুবোজাহাজ সব বুঝি টাটানগরের কারখানাতেই তৈরি হয় যেখানে সে কাজ করতে চলেছে। ভোম্বলের কাকা হারান চাকি খুব কঠোর প্রকৃতির মানুষ এবং তার ওপর নির্মম প্রহারও করে থাকেন তাই ভোম্বল তাঁর থেকে বারংবার পালিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু তিনি যে ভোম্বলকে ভালবাসেন সেটা বোঝা যায় যখন এটা বলতে বলতে তাঁর চোখে জল এসে যায়-"তুমি যে খালি পায়ে, খালি গায়ে, খালি হাতে এরকম অভুক্ত অবস্থায় পথে পথে পাগলের মতো ঘুরছো, এ কথা ভাবতেই যে আমার কষ্ট হয়। তুমি আমারই বড়ো ভাইয়ের ছেলে!" 
                                          বইটি আরও ভাল হতে পারতো যদি না লেখক কাহিনীটিকে অযথা টেনে বড় করতেন। একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি পাঠককে ক্লান্ত করে দেয়। শেষের দিকটা পড়তে পড়তে মনে হয় হয়তো এইবার কোন চমক আসবে কিন্তু সেই চমক আর আসে না, কেমন হঠাৎ করেই যেন লেখক কাহিনীটির ইতি টেনে দেন। এছাড়া বইয়ের বাঁধাইয়ের দিকে প্রকাশক যদি আরেকটু যত্ন নিতেন তাহলে ভাল হতো। 
                                          তবুও বইটি পড়লে বাংলার মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায় এবং কোন গ্রামে চলে যেতে মন চায়। আমাদের "বাংলা" যে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা তা আমরা পড়তে পড়তে বুঝতে পারি কারণ অবিভক্ত বাংলার পল্লীজীবনকে লেখক অপরূপ ভাবে তুলে ধরেছেন। তাই এই বইটি সকলের অবশ্যই পড়া উচিত বলে আমার মনে হয় কারণ এটি না পড়লে পাঠক অনেক স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবেন।

মূল্যায়ন- ৩/৫

সোমবার, ২৯ জুন, ২০২০

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ১

পাঠ প্রতিক্রিয়া : সেই গ্রাম, সেই সব মানুষ





 

বইয়ের নাম- সেই গ্রাম, সেই সব মানুষ
লেখক- শ্রী মনোজ বসু
প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রাঃ) লিমিটেড 
প্রকাশকাল- পৌষ, ১৩৮২
পৃষ্ঠা- ২২৪





সারসংক্ষেপ- সোনাখড়ি গ্রামের ভবনাথের বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে তাঁর বাবা মারা যাওয়ায়, সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ঘাড়ে। ছোট ভাই দেবনাথ তখন নাবালক। ভবনাথের সম্বল বলতে তখন ছিল পৈতৃক দুটো গাঁতি এবং কিছু খামারজমি। এমন সময় শরিকেরা বিভিন্ন ছুতো তুলে মামলা জুড়ে তাঁকে ঘায়েল করতে চাইলেও, তিনি এক কাঠা জমিও নষ্ট হতে দেননি, উপরন্তু বাড়িয়েছেন। এখন অনেক বছর কেটে গেছে, ভবনাথ ছোট ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন, তাঁর বিয়ে দিয়েছেন। দেবনাথ এখন কলকাতায় জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করেন, মাঝেমধ্যে গ্রামে আসেন, কিন্তু তাঁর পরিবার গ্রামে থাকেন। ভবনাথের স্ত্রী উমাসুন্দরী ছোট জা তরঙ্গিণীকে ছোট বোনের মতো ভালবাসেন। দেবনাথের তিন মেয়ে ও এক ছেলে আর ভবনাথের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এই একান্নবর্তী পরিবারের মানুষদের জীবনের নানা সুখ-দুঃখ , টানাপোড়েনের কাহিনী নিয়েই এই উপন্যাস।

পাঠ প্রতিক্রিয়া- এখানে সবথেকে আমাকে যেই জিনিসটি আকৃষ্ট করেছে সেটি হলো বাংলার বিভিন্ন ব্রত-পার্বন, লোকাচার ও রীতিনীতিকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখক নবান্ন উৎসব, দুর্গোৎসব, রথযাত্রা, গারসি ব্রত ,জামাইষষ্ঠী, এইসকল উৎসব গ্রামবাংলায় কি ভাবে পালন করা হয় তার অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। পরিবারের মেয়েদের আমসত্ত্ব করা, কাসুন্দি বানানো আর বড়ি দেওয়ার কথা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমি নিজেও একবার চেষ্টা করে দেখলে পারি ওগুলো বানাতে পারি কিনা।
                                    "আশ্বিন যায় কার্তিক আসে,
                                         মা-লক্ষ্মী গর্ভে বসে,
                                     সাধ খাও মা, সাধ খাও-"
এই বলে যে ধানক্ষেতকে সাধ খাওয়ানো হয় সেটা আমি এই বই না পড়লে জানতে পারতাম না। দেবনাথের ছেলে কমল আর মেয়ে পুঁটির খেলাধুলো করা, বৃষ্টির সময় আম কুড়িয়ে বেড়ানোর কথা আমাকে বারবার "পথের পাঁচালির" "অপু" ও "দুর্গার" কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। প্রত্যেক ঋতুতে প্রকৃতি কিরকম নানা রূপে সেজে ওঠে তার অসাধারণ বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।
                                     উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ভবনাথকে আমার ভীষণ ভাল লেগেছে। তিনি একদিকে শক্ত হাতে পরিবারকে রক্ষা করেন এবং তাঁর গাম্ভীর্যের জন্য পরিবারের আর গ্রামের মানুষ তাঁকে সমীহ করে চলে, আবার অন্যদিকে দেবনাথের ছেলে কমলের অনেক শিশুসুলভ আবদার তিনি মেনে নেন। দেবনাথের কন্যা চঞ্চলার মৃত্যুতে তাঁকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে বোঝা যায় যে তাঁর মন কতটা নরম। দেবনাথ তাঁর অগ্রজকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন এবং তাঁর হাতে হাত মিলিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করে যান। গ্রামের সবাই তাই এই দুই ভাইকে "রাম-লক্ষণ" বলে থাকে। ভবনাথের স্ত্রী উমাসুন্দরী তাঁর স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী। অন্দরমহলের সমস্ত কিছু তাঁর নখদর্পণে। তাঁকে সাহায্য করেন তরঙ্গিণী আর ভবনাথের পুত্রবধূ অলকা। তরঙ্গিণী দুটি সন্তান হারানোর পরেও জীবনের কাছে হারতে শেখেননি, সমস্ত কর্তব্য ঠিক ঠিক পালন করে যান।
                                     গ্রামবাংলার চিত্রটি লেখক খুব সুন্দর করে এই উপন্যাসে এঁকেছেন। যারা গ্রামকেন্দ্রিক উপন্যাস পড়তে ভালবাসেন তাদের এই বইটি অবশ্যই ভাল লাগবে বলে আমার মনে হয়।
                                     বইটিতে কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়ে আর কাগজের মান আরেকটু ভাল হলে মন্দ হতো না। উপন্যাসের শেষের দিকে আমার মনে হয়েছে লেখক বোধহয় কাহিনীটিকে একটু অযথা টেনে বড় করতে চেয়েছেন, যদিও সামগ্রিকভাবে আমার উপন্যাসটি বেশ ভালই লেগেছে।

মূল্যায়ন- ৪.৫/৫

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ২

পাঠ প্রতিক্রিয়া : ভোম্বল সর্দার বইয়ের নাম-  ভোম্বল সর্দার লেখক-  খগেন্দ্রনাথ মিত্র প্রকাশক-  নবপত্র প্রকাশন পৃষ্ঠা-  ৩২৮ সারসংক্ষেপ-  এই উপন...