পাঠ প্রতিক্রিয়া : ভোম্বল সর্দার
বইয়ের নাম- ভোম্বল সর্দার
লেখক- খগেন্দ্রনাথ মিত্র
প্রকাশক- নবপত্র প্রকাশন
পৃষ্ঠা- ৩২৮
পাঠ প্রতিক্রিয়া- এই উপন্যাসের পটভূমি গ্রামবাংলা। লেখক বাংলার গাছপালা, পশু-পাখী, নদী-নালা, খাল-বিলের অপূর্ব বিবরণ দিয়েছেন। গ্রামীণ মানুষের জীবনযাত্রার কথা এত সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে যে সব কিছুকে যেন জীবন্ত বলে মনে হয়, তা সে কোন পল্লীবধূর চুল ঝাড়ার বর্ণনা হোক, কি পাঠশালার কোলাহলের বিবরণ হোক, কি গ্রামের মানুষের অন্নপ্রাশন বাড়িতে ভোজ খাওয়ার বর্ণনা হোক। সাধারণ খাবারের কথা পড়েও খিদে পেয়ে যায়। গ্রামের মানুষ পর কে যে কত সহজে আপন করে নিতে পারে তা এই উপন্যাস না পড়লে আমি জানতে পারতাম না। ভোম্বলের কথা পড়তে গিয়ে বুঝতে পেরেছি যে লেখক একটি কিশোরের মনকে নিপুণ ভাবে বোঝার ফলেই এই উপন্যাসটি লিখতে পেরেছেন। এক পিতৃমাতৃহীন ছেলের মন যে কেমন হাহাকার করে তা আমরা বইটি পড়ে ভালভাবেই বুঝতে পারি। তাই ভোম্বলের মনে মাঝে মধ্যে প্রশ্ন জাগে যে তার কাকা-কাকিমা কি তাকে আদৌ ভালবাসেন? সে ভাবে যে তার মা-বাবা যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে কি তার সাথে একই রকম ব্যবহার করতেন? তার ধারণা হয় যে কেউই তাকে ঠিক মতো বুঝতে পারে না।
এই উপন্যাসের প্রধান চরিত্র ভোম্বল। সে যেহেতু একজন কিশোর তাই তার মন স্বাভাবিক ভাবেই আবেগপ্রবণ। তাই সে কথায় কথায় তার কাকা-কাকিমার ওপর অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়। সে বাস্তবজ্ঞানহীন বলেই বাড়ি ছাড়ার আগে এটা ভেবে দেখে না যে সে পথে কোথায় আশ্রয় পাবে বা কি খাবে, হাতে কিছু টাকা রাখার কথাও তাই তার মনে আসে না। বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়ার পর এক গ্রামের একজন বৃদ্ধা ভোম্বলকে আশ্রয় দেয় এবং বলে যে ভোম্বল যদি তার কাছে থেকে যায় তাহলে তার সমস্ত সম্পত্তি সে তাকে দিয়ে দেবে, তা সত্ত্বেও ভোম্বল সেখান থেকে পালিয়ে যায় এই ভেবে যে গ্রামের থেকে টাটানগর অনেক শ্রেয়, যা থেকে আমরা বুঝতে পারি তার বুদ্ধি কতটা অপরিণত। ভোম্বলের আত্মমর্যাদাবোধ যে কতটা তা বোঝা যায় যখন তার বন্ধু সুধীরের মামারবাড়িতে অব্রাহ্মণ বলে অপমানিত হওয়ার পরে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে, "বামুনবাড়িতে আর কখনও জল খাব না।" ভোম্বল কল্পনাপ্রবণ বলেই নিজের মতো করে টাটানগরের কারখানার চিত্র নিজের মনের মধ্যে এঁকে নেয়, সে ভাবে মোটরগাড়ি, এরোপ্লেন, ডুবোজাহাজ সব বুঝি টাটানগরের কারখানাতেই তৈরি হয় যেখানে সে কাজ করতে চলেছে। ভোম্বলের কাকা হারান চাকি খুব কঠোর প্রকৃতির মানুষ এবং তার ওপর নির্মম প্রহারও করে থাকেন তাই ভোম্বল তাঁর থেকে বারংবার পালিয়ে বাঁচতে চায়, কিন্তু তিনি যে ভোম্বলকে ভালবাসেন সেটা বোঝা যায় যখন এটা বলতে বলতে তাঁর চোখে জল এসে যায়-"তুমি যে খালি পায়ে, খালি গায়ে, খালি হাতে এরকম অভুক্ত অবস্থায় পথে পথে পাগলের মতো ঘুরছো, এ কথা ভাবতেই যে আমার কষ্ট হয়। তুমি আমারই বড়ো ভাইয়ের ছেলে!"
বইটি আরও ভাল হতে পারতো যদি না লেখক কাহিনীটিকে অযথা টেনে বড় করতেন। একই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি পাঠককে ক্লান্ত করে দেয়। শেষের দিকটা পড়তে পড়তে মনে হয় হয়তো এইবার কোন চমক আসবে কিন্তু সেই চমক আর আসে না, কেমন হঠাৎ করেই যেন লেখক কাহিনীটির ইতি টেনে দেন। এছাড়া বইয়ের বাঁধাইয়ের দিকে প্রকাশক যদি আরেকটু যত্ন নিতেন তাহলে ভাল হতো।
তবুও বইটি পড়লে বাংলার মাটির ঘ্রাণ পাওয়া যায় এবং কোন গ্রামে চলে যেতে মন চায়। আমাদের "বাংলা" যে সুজলা-সুফলা শস্য-শ্যামলা তা আমরা পড়তে পড়তে বুঝতে পারি কারণ অবিভক্ত বাংলার পল্লীজীবনকে লেখক অপরূপ ভাবে তুলে ধরেছেন। তাই এই বইটি সকলের অবশ্যই পড়া উচিত বলে আমার মনে হয় কারণ এটি না পড়লে পাঠক অনেক স্বাদ থেকে বঞ্চিত হবেন।
মূল্যায়ন- ৩/৫

