পাঠ প্রতিক্রিয়া : সেই গ্রাম, সেই সব মানুষ
বইয়ের নাম- সেই গ্রাম, সেই সব মানুষ
লেখক- শ্রী মনোজ বসু
প্রকাশক- বেঙ্গল পাবলিশার্স (প্রাঃ) লিমিটেড
প্রকাশকাল- পৌষ, ১৩৮২
পৃষ্ঠা- ২২৪
সারসংক্ষেপ- সোনাখড়ি গ্রামের ভবনাথের বিয়ের কিছুদিনের মধ্যে তাঁর বাবা মারা যাওয়ায়, সংসারের সমস্ত দায়িত্ব এসে পড়ে তাঁর ঘাড়ে। ছোট ভাই দেবনাথ তখন নাবালক। ভবনাথের সম্বল বলতে তখন ছিল পৈতৃক দুটো গাঁতি এবং কিছু খামারজমি। এমন সময় শরিকেরা বিভিন্ন ছুতো তুলে মামলা জুড়ে তাঁকে ঘায়েল করতে চাইলেও, তিনি এক কাঠা জমিও নষ্ট হতে দেননি, উপরন্তু বাড়িয়েছেন। এখন অনেক বছর কেটে গেছে, ভবনাথ ছোট ভাইকে লেখাপড়া শিখিয়ে মানুষ করেছেন, তাঁর বিয়ে দিয়েছেন। দেবনাথ এখন কলকাতায় জমিদারি সেরেস্তায় কাজ করেন, মাঝেমধ্যে গ্রামে আসেন, কিন্তু তাঁর পরিবার গ্রামে থাকেন। ভবনাথের স্ত্রী উমাসুন্দরী ছোট জা তরঙ্গিণীকে ছোট বোনের মতো ভালবাসেন। দেবনাথের তিন মেয়ে ও এক ছেলে আর ভবনাথের তিন ছেলে ও এক মেয়ে। এই একান্নবর্তী পরিবারের মানুষদের জীবনের নানা সুখ-দুঃখ , টানাপোড়েনের কাহিনী নিয়েই এই উপন্যাস।
পাঠ প্রতিক্রিয়া- এখানে সবথেকে আমাকে যেই জিনিসটি আকৃষ্ট করেছে সেটি হলো বাংলার বিভিন্ন ব্রত-পার্বন, লোকাচার ও রীতিনীতিকে সুন্দর ভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। লেখক নবান্ন উৎসব, দুর্গোৎসব, রথযাত্রা, গারসি ব্রত ,জামাইষষ্ঠী, এইসকল উৎসব গ্রামবাংলায় কি ভাবে পালন করা হয় তার অপূর্ব বর্ণনা দিয়েছেন। পরিবারের মেয়েদের আমসত্ত্ব করা, কাসুন্দি বানানো আর বড়ি দেওয়ার কথা পড়তে পড়তে মনে হচ্ছিল, আমি নিজেও একবার চেষ্টা করে দেখলে পারি ওগুলো বানাতে পারি কিনা।
"আশ্বিন যায় কার্তিক আসে,মা-লক্ষ্মী গর্ভে বসে,
সাধ খাও মা, সাধ খাও-"
এই বলে যে ধানক্ষেতকে সাধ খাওয়ানো হয় সেটা আমি এই বই না পড়লে জানতে পারতাম না। দেবনাথের ছেলে কমল আর মেয়ে পুঁটির খেলাধুলো করা, বৃষ্টির সময় আম কুড়িয়ে বেড়ানোর কথা আমাকে বারবার "পথের পাঁচালির" "অপু" ও "দুর্গার" কথা মনে করিয়ে দিচ্ছিল। প্রত্যেক ঋতুতে প্রকৃতি কিরকম নানা রূপে সেজে ওঠে তার অসাধারণ বর্ণনা পড়ে মুগ্ধ হয়েছি।
উপন্যাসের অন্যতম প্রধান চরিত্র ভবনাথকে আমার ভীষণ ভাল লেগেছে। তিনি একদিকে শক্ত হাতে পরিবারকে রক্ষা করেন এবং তাঁর গাম্ভীর্যের জন্য পরিবারের আর গ্রামের মানুষ তাঁকে সমীহ করে চলে, আবার অন্যদিকে দেবনাথের ছেলে কমলের অনেক শিশুসুলভ আবদার তিনি মেনে নেন। দেবনাথের কন্যা চঞ্চলার মৃত্যুতে তাঁকে হাউহাউ করে কাঁদতে দেখে বোঝা যায় যে তাঁর মন কতটা নরম। দেবনাথ তাঁর অগ্রজকে পরম শ্রদ্ধার চোখে দেখেন এবং তাঁর হাতে হাত মিলিয়ে সংসারের দায়িত্ব পালন করে যান। গ্রামের সবাই তাই এই দুই ভাইকে "রাম-লক্ষণ" বলে থাকে। ভবনাথের স্ত্রী উমাসুন্দরী তাঁর স্বামীর যোগ্য সহধর্মিণী। অন্দরমহলের সমস্ত কিছু তাঁর নখদর্পণে। তাঁকে সাহায্য করেন তরঙ্গিণী আর ভবনাথের পুত্রবধূ অলকা। তরঙ্গিণী দুটি সন্তান হারানোর পরেও জীবনের কাছে হারতে শেখেননি, সমস্ত কর্তব্য ঠিক ঠিক পালন করে যান।
গ্রামবাংলার চিত্রটি লেখক খুব সুন্দর করে এই উপন্যাসে এঁকেছেন। যারা গ্রামকেন্দ্রিক উপন্যাস পড়তে ভালবাসেন তাদের এই বইটি অবশ্যই ভাল লাগবে বলে আমার মনে হয়।
বইটিতে কিছু ছাপার ভুল চোখে পড়ে আর কাগজের মান আরেকটু ভাল হলে মন্দ হতো না। উপন্যাসের শেষের দিকে আমার মনে হয়েছে লেখক বোধহয় কাহিনীটিকে একটু অযথা টেনে বড় করতে চেয়েছেন, যদিও সামগ্রিকভাবে আমার উপন্যাসটি বেশ ভালই লেগেছে।
মূল্যায়ন- ৪.৫/৫
